শেখ মোহাম্মদ পারভেজ
পাবনা সদর উপজেলার সাদুল্লাপুর ইউনিয়নে দুবলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও হাজি জসিম উদ্দিন বিশ্বাস ডিগ্রি কলেজ মাঠে জেলা প্রশাসনের লিখিত অনুমোদন ছাড়াই সার্কাস ও বাণিজ্য মেলার প্রস্তুতি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে মাঠে সার্কাসের প্যান্ডেল নির্মাণের কাজ চলছে। পাশাপাশি মেলার নামে দোকান বরাদ্দ দিয়ে অর্থ লেনদেনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে এ ধরনের আয়োজন ঘিরে শিক্ষার পরিবেশ, মাঠের ব্যবহার, জনদুর্ভোগ এবং মেলার আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের উন্নয়নের কথা বলে মেলার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হলেও সেই অর্থের সঠিক হিসাব ও ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুবলিয়া স্কুল ও কলেজ মাঠে প্রতিবছর মেলা আয়োজনের চেষ্টা করা হয়। এতে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মাসব্যাপী মেলার কারণে পরিবেশ দূষণ ও দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়, যা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।
তাদের দাবি, প্রায় ৫০ বছর ধরে মেলার নামে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। গত ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যালয়ের উন্নয়নের কথা বলে মেলা কমিটির কাছ থেকে প্রতিবছর চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। তবে ওই অর্থের যথাযথ হিসাব ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মেলার মাঠে দোকান বরাদ্দ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন কাগজপত্র দেখিয়ে মাঠের বিভিন্ন স্থানে দোকান বসানোর জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো দোকানের জায়গা ১২ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এসব অর্থ কারা সংগ্রহ করছেন, কোথায় জমা রাখা হচ্ছে এবং বিদ্যালয়ের উন্নয়নে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে—তা স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এদিকে কলেজ মাঠে সার্কাসের প্যান্ডেল নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, সার্কাসের নামে চিত্রজগতের নায়ক-নায়িকাদের অংশগ্রহণে অশালীন নৃত্য পরিবেশনের আয়োজন করা হতে পারে। এ ছাড়া সার্কাসের নামে হাতি নিয়ে গ্রামগঞ্জে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
সার্কাস ও মেলার আয়োজন ঘিরে জনদুর্ভোগের আশঙ্কাও করছেন স্থানীয়রা। মাঠের পাশেই রয়েছে পোস্ট অফিস ও কমিউনিটি হাসপাতাল। ফলে শিক্ষার্থী, রোগী এবং সরকারি সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে বলে তাদের ধারণা।
মেলার পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, অতীতে মেলায় জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। মেলার আড়ালে জুয়া ও অশালীন নৃত্যের আসর বসার অভিযোগও রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড এলাকার তরুণদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার পরিবেশ এমনিতেই নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজন করা হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও স্বাভাবিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। তাই বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে দুবলিয়া মেলা কমিটির কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন ও কলেজের অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, “মেলার বিষয়ে কোনো লিখিত অনুমোদন দেওয়া হয়নি। যদি কেউ এ ধরনের কাজ করে থাকে, তাহলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
অনুমোদন ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা ও সার্কাস আয়োজনের অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া গেলেও স্থানীয়দের উত্থাপিত অর্থের হিসাব, দোকান বরাদ্দ এবং অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।