• শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম
অল্প পানিতেই তলিয়ে যায় কাঁচা রাস্তা, চরম দুর্ভোগে এলাকাবাসী শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষক-অভিভাবকদের করণীয় নিয়ে মতবিনিময় সভা চাঁদা দাবির অভিযোগ অস্বীকার পাউবো শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের, তদন্তের দাবি ধামইরহাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনের ড্রেন থেকে মানব ভ্রূণ উদ্ধার রায়গঞ্জে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, গত রাতে ৩টি পল্লী বিদ্যুৎ এর টান্সপার্ফার চুরু, কৃষকের ৪ গরু চুরি, আজ ধানগড়া থেকে মোটরসাইকেল চুরি। ধামইরহাটে ২০০ টাকার জেরে যুবক খুন। চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরলেন মির্জা আব্বাস ধামইরহাটে ৫৩তম গ্রীষ্মকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণ গোমস্তাপুরে প্রাণিসম্পদ বিভাগের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গোমস্তাপুরে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে র‍্যালি ও আলোচনা সভা

যে বাবার ‘বুলবুলি’ আর কোনোদিন ফেরেনি, সন্তানের শোকে ভেঙে পড়েছিলেন নজরুল

Reporter Name / ৫০ Time View
Update : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬

যে বাবার ‘বুলবুলি’ আর কোনোদিন ফেরেনি, সন্তানের শোকে ভেঙে পড়েছিলেন নজরুল

 

শেখ মোহাম্মদ পারভেজ

‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে / আমার গানের বুলবুলি’—কয়েকটি পঙ্‌ক্তিতেই যেন জমে আছে এক বাবার বুকভরা হাহাকার

 

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা চিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠের কবি হিসেবে। তাঁর কলমে ছিল বিদ্রোহ, সাম্য, প্রেম ও মানবতার কথা। কিন্তু জীবনের এক নির্মম অধ্যায় সেই দুর্দান্ত কবিকেও নিঃশব্দ করে দিয়েছিল। সন্তানের মৃত্যু যে একজন বাবাকে কতটা অসহায় করে দিতে পারে, নজরুলের জীবন তারই এক বেদনাবিধুর উদাহরণ।

নজরুলের আদরের সন্তান অরিন্দম খালেদ—পরিবারে যিনি ‘বুলবুল’ নামে পরিচিত ছিলেন—ছিলেন কবির অত্যন্ত প্রিয়। শিশুটিকে ঘিরে ছিল বাবার নানা স্বপ্ন। কিন্তু অসুস্থতা কেড়ে নেয় সেই ছোট্ট প্রাণ। আর সন্তানের মৃত্যু নজরুলের জীবনে রেখে যায় গভীর এক শূন্যতা।

একজন কবির কাছে সন্তান শুধু পরিবারের সদস্য নয়; সে হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতের স্বপ্ন, আনন্দ ও সৃষ্টির অনুপ্রেরণা। বুলবুলও নজরুলের জীবনে তেমনই এক ভালোবাসার নাম ছিল। শিশুটির হাসি, কণ্ঠ, ছোট্ট ছোট্ট দুষ্টুমি—সবকিছুতেই ছিল বাবার আনন্দ।

কিন্তু সেই আনন্দ একসময় পরিণত হয় শোকে।

বুলবুল গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের ওপর নেমে আসে উৎকণ্ঠা। তখনকার চিকিৎসাব্যবস্থা আজকের মতো উন্নত ছিল না। সন্তানের জীবন বাঁচানোর আকুতি নিয়ে একজন বাবা যতটা অসহায় হতে পারেন, নজরুলও সম্ভবত সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলেন।

শেষ পর্যন্ত বুলবুলকে বাঁচানো যায়নি।

সন্তানের মৃত্যুর পর যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা কোনো শব্দে পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যে ঘরে শিশুর হাসি ছিল, সেখানে নেমে আসে নীরবতা। যে কণ্ঠে ছিল প্রাণের স্পন্দন, তা হঠাৎ থেমে যায়। আর একজন বাবা থেকে যান স্মৃতি, বেদনা ও অপূরণীয় শূন্যতা নিয়ে।

এই বেদনার সঙ্গে চিরকাল যুক্ত হয়ে আছে নজরুলের হৃদয়স্পর্শী পঙ্‌ক্তি—

‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে
আমার গানের বুলবুলি…’

‘গানের বুলবুলি’—শব্দবন্ধটিই যেন বহন করে এক গভীর আবেগ। এখানে বুলবুলি শুধু একটি পাখির প্রতীক নয়; এটি হয়ে ওঠে বাবার কাছে হারিয়ে যাওয়া এক প্রিয় সন্তানের স্মৃতি, ভালোবাসা ও অপূর্ণতার প্রতীক।

সন্তানকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু স্মৃতি থেকে তাকে মুছে ফেলাও সম্ভব নয়। একজন কবির হাতে সেই স্মৃতিই হয়ে উঠতে পারে গান, কবিতা কিংবা অমর সৃষ্টির অংশ। নজরুলের ক্ষেত্রেও বুলবুলের স্মৃতি তাঁর জীবন ও সৃষ্টির সঙ্গে এক বেদনাময় অধ্যায় হিসেবে থেকে গেছে।

‘বাগিচায় বুলবুলি’ নিয়ে যে ভুল ধারণা

নজরুলের ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে’ গানটি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে—এটি নাকি ছেলে বুলবুলের মৃত্যুর পর সন্তানের শোকে লেখা। তবে গানটির রচনাকাল ও বুলবুলের জীবনকাল বিবেচনায় এই দাবিকে সরাসরি ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

অর্থাৎ, ‘বাগিচায় বুলবুলি’ এবং ‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি’—দুটি গানকে একই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক নয়। প্রচলিত গল্পের আবেগ থাকলেও ইতিহাসের সময়রেখা দিয়ে বিষয়টি যাচাই করা জরুরি।

তবে ‘বুলবুল’ নামটি যে নজরুলের জীবনে গভীর আবেগ ও বেদনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

বিদ্রোহী কবিরও ছিল এক অসহায় বাবা-হৃদয়

নজরুল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে কণ্ঠ তুলেছেন, কারাবরণ করেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখেছেন। তাঁর কবিতায় ছিল প্রতিবাদের আগুন। কিন্তু সন্তানের মৃত্যুর সামনে সেই বিদ্রোহী কবিও ছিলেন অসহায় একজন বাবা।

শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায়; কিন্তু মৃত্যুর বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই কতটা সীমিত—সন্তান হারানোর অভিজ্ঞতা সেই নির্মম সত্যই সামনে আনে।

বুলবুল আজ নেই। নজরুলও নেই। কিন্তু পিতা-মাতার সন্তানের প্রতি ভালোবাসার যে অনুভূতি, তা সময়ের সঙ্গে বদলায় না। তাই বহু বছর পরও নজরুলের সেই বেদনার পঙ্‌ক্তি মানুষের হৃদয়ে অনুরণিত হয়—

‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে
আমার গানের বুলবুলি…’

কয়েকটি শব্দে যেন ধরা পড়ে এক বাবার কান্না, একটি শিশুর অসমাপ্ত জীবন এবং স্মৃতিকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার এক অসীম আকুতি।

মৃত্যু বুলবুলকে নিয়ে গেছে; কিন্তু বাবার ভালোবাসা ও স্মৃতি থেকে তাকে মুছে দিতে পারেনি


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category