• সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রেসক্লাবে মন্টু সভাপতি ও ফয়সাল মাহমুদ সম্পাদক নির্বাচিত টেকনাফে বিজিবির পৃথক অভিযানে ৪ লাখ ৪০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার জাতির প্রয়োজনে আট দফা এক দফায় রূপ নেবে: জামায়াত আমির ধামইরহাটে শিশু নির্যাতনের মামলা ‘মিথ্যা’ দাবি করে মানববন্ধন। মিরপুর-১১ নম্বরে চলন্ত বাসে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস শিক্ষা, সমাজসেবা ও রাজনীতি—তিন অঙ্গনে সক্রিয় আলেয়া জাহান মৌ ফুটবল ম্যাচে পক্ষপাতের অভিযোগ, খেলোয়াড়দের মারধরের হুমকি শিবগঞ্জ সীমান্তে ৫৯ বিজিবি’র অভিযানে হেরোইনসহ আটক দুই গোমস্তাপুরে পুকুরের পানিতে ডুবে ৩ বছরের শিশুর মৃত্যু সীরাতুন্নবী (সা.) উপলক্ষে বিশ্বনাথে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

নিভে যাওয়া শৈশব: বাল্যবিবাহের অন্ধকার বাস্তবতা

Reporter Name / ২৭ Time View
Update : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

নিভে যাওয়া শৈশব:

বাল্যবিবাহের অন্ধকার বাস্তবতা

 

 

মোঃ সিমান্ত তালুকদার

শৈশবের রঙিন আকাশে যখন বিয়ের বোঝা নেমে আসে, তখন একটি শিশুর স্বপ্নগুলো নীরবেই ঝরে পড়ে। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে, যদিও এই বিষয়ে সুস্পষ্ট আইন বিদ্যমান।

“বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭” অনুযায়ী মেয়েদের বৈধ বিবাহের বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে এই আইনের সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না। স্থানীয় পর্যায়ে জন্মনিবন্ধন সনদ জাল করে বয়স বাড়িয়ে দেখানো হয়, কাজী ও স্থানীয় প্রশাসনের একাংশের যোগসাজশে গোপনে বিয়ে সম্পন্ন হয়, আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হওয়ায় অভিযোগ দায়ের কম হয়, আর প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রশাসনিক নজরদারিও দুর্বল থেকে যায়। এর পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতার অভাব এই সমস্যাকে আরও গভীর করে তুলছে। অনেক পরিবার এখনও মনে করে মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দেওয়াই নিরাপত্তার একমাত্র উপায়, আর শিক্ষার অভাব ও প্রজন্মান্তরে চলে আসা ভুল ধারণা এই মানসিকতাকে টিকিয়ে রেখেছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাল্যবিবাহ শুধু দরিদ্র পরিবারেই সীমাবদ্ধ নয়, ধনী পরিবারেও এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দরিদ্র পরিবারে যৌতুকের বোঝা কমানো, আর্থিক চাপ লাঘব করা এবং ইভটিজিং বা যৌন হয়রানির আশঙ্কা থেকে বাঁচার চেষ্টায় কম বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে ধনী পরিবারে পারিবারিক সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার নামে, প্রেমঘটিত সম্পর্ক আটকাতে চাপ প্রয়োগ করে, কিংবা পারিবারিক বা ব্যবসায়িক স্বার্থে সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে বিয়ে দেওয়া হয়।

এছাড়া ধর্মীয় কুসংস্কারও একটি বড় কারণ। ধর্মের ভুল ব্যাখ্যাকে অজুহাত করে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হয়, যদিও প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এর ফলে মেয়েদের ওপর যে সমস্যাগুলো হয় তা অত্যন্ত গুরুতর। একটি পুতুল নিয়ে খেলার বয়সেই যেন তার কাঁধে চেপে বসে সংসারের ভার। অপরিণত বয়সে গর্ভধারণে মাতৃমৃত্যু ও প্রসবজনিত জটিলতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিয়ের পরপরই পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, ফলে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পারিবারিক দায়িত্ব ও নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর চাপে মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আবার যৌতুক নির্যাতন ও গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার হওয়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়। স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ না পেয়ে তারা সারাজীবন পরনির্ভরশীল থেকে যায়।

আইন অনুযায়ী নির্ধারিত বয়সের আগে বিয়ে হলে ছেলেদেরও কম সমস্যা হয় না। শিক্ষা বা কর্মজীবন গড়ার আগেই সাংসারিক দায়িত্ব নিতে বাধ্য হতে হয়, আর্থিক প্রস্তুতি ছাড়াই পরিবার প্রতিপালনের চাপ নিতে হয়, মানসিকভাবে অপরিণত অবস্থায় দাম্পত্য সম্পর্ক পরিচালনা করতে গিয়ে জটিলতায় পড়তে হয়, এবং ক্যারিয়ার গঠনে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে থাকতে হয়।

একটি লক্ষণীয় ও উদ্বেগজনক দিক হলো, অনেক ক্ষেত্রে যার বাল্যবিবাহ হচ্ছে সে নিজেই বুঝতে পারে না যে এটি তার জন্য কতটা ক্ষতিকর। পরিবার ও সমাজের চাপে বড় হওয়া এই কিশোরী বা কিশোর নিজেও সচেতন থাকে না যে আইনত ও স্বাস্থ্যগতভাবে এই বিয়ে তার ভবিষ্যতের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে ভিকটিম নিজে থেকে প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা, বরং পরিবারের সিদ্ধান্তকে স্বাভাবিক বলেই মেনে নেয়। অন্ধকারে হাঁটতে থাকা মানুষ যেমন নিজের পথ হারানোর কথা টেরই পায় না, তেমনি এখানেই সচেতনতার অভাব সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন, বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ ও কমিউনিটি পর্যায়ে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে তারা মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছে।

তবে এই প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়; এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে আরও শক্তিশালী সহযোগিতা প্রয়োজন—আর্থিক সহায়তা, নীতিগত সমর্থন এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে এই সংগঠনগুলোর কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সচেতনতা তৈরির কাজ শুরু করতে হবে একেবারে কিশোর-কিশোরী ও যুব বয়স থেকেই। বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে বাল্যবিবাহের কুফল, আইনগত অধিকার এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে পারলে তারা নিজেরাই সচেতন হয়ে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারবে, যা দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যা সমাধানে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে।

এই সমস্যা মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন, কাজী ও জন্মনিবন্ধন কার্যালয়ে নজরদারি জোরদার করা, বিদ্যালয় ও কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো, ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে সঠিক ব্যাখ্যা প্রচার করা, অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ করা এবং মেয়েদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

বাল্যবিবাহ শুধু একটি আইনি সমস্যা নয়, এটি গভীরভাবে সামাজিক মানসিকতার সাথে জড়িত, তাই কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন এবং শিক্ষার প্রসার ছাড়া এই সমস্যার প্রকৃত সমাধান সম্ভব নয়। প্রতিটি শিশুর হাতে বই থাকুক, বিয়ের বোঝা নয়, এই প্রত্যাশাতেই গড়ে উঠুক আগামীর বাংলাদেশ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category